ধানের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে কিছুই করার নেই?

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা ফসল উত্পাদন করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে তাদের জীবনমানের প্রতি আমরা এতোটাই উদাসীন যে উত্পাদিত ফসল বিক্রি করে উত্পাদন খরচটুকুও তুলতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। দেশের অনেক জায়গাতেই বোরো মৌসুমের ধান ঘরে তোলা শুরু হয়েছে। ‘ফণী’র শঙ্কা কাটিয়ে বাম্পার ফলন ঘরে তুলছে আমাদের কৃষক। ঝড়ে যদিও অনেক জায়গাতেই কিছু ধান নষ্ট হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেশে বোরোর বাম্পার ফলনে কৃষকের ঘরে খুশির আমেজ থাকার কথা—অথচ খুশির বদলে তাদের মনে ভর করেছে হতাশা। এর মধ্যে দেশের কয়েক জায়গায় কিছু কৃষক প্রতিবাদও করেছেন। বাজারে ধানের দাম এতোই কম যে তাঁদের উত্পাদন খরচও উঠে আসছে না।

বোরো মৌসুমে ধানের উত্পাদন পুরোটাই যান্ত্রিক সেচের ওপর নির্ভরশীল। তদুপরি সার, জমিতে হাল দেওয়া ও শ্রমিকের খরচ এই মৌসুমে উত্পাদন খরচকে অনেক বাড়িয়ে দেয়। খবরে প্রকাশ, এই মৌসুমে প্রতিকেজি ধান উত্পাদনে কৃষকের গড়ে খরচ হয়েছে ২৪ টাকা। সেই অনুযায়ী প্রতি মণ ধানের ন্যূনতম মূল্য হওয়া উচিত ৯০০ টাকা—কিন্তু বাজারে যা ৭০০ টাকার বেশি নয়, কোনো কোনো জায়গায় তো এর চেয়েও কম!

বর্তমান সরকারের যুগোপযোগী পদক্ষেপ, কৃষিবিদ ও কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে গত কয়েক বছরে ধানের উত্পাদন অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ধান উত্পাদন হয়েছে ৩ কোটি ৬২ লাখ মেট্রিক টন। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিতে কৃষির গুরুত্ব বাড়লেও কৃষকের জীবনমান নিচের দিকে নামছে। এদিকে আমরা নিজস্ব অর্থায়নেই বিলিয়ন ডলারের মেগা প্রজেক্ট সম্পন্ন করছি। চাকরিজীবীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি বেতন বাড়ানো হয়েছে, যাতে খরচ হচ্ছে হাজারো কোটি টাকা। তবে কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে সংশ্লি­ষ্ট দপ্তরগুলোর কেন এই কৃপণতা?

নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত কৃষকের প্রধান সমস্যা হলো ঋণ। মহাজনের কাছে ধারদেনা করে তাঁরা ফসল ফলানোর খরচ জোগাড় করেন। এই ঋণ পরিশোধে ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কৃষককে ধান বিক্রি করতে হয় আর এই সুযোগটাই নেয় মধ্যসত্ত্বভোগীরা। কৃষকের অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তারা সিন্ডিকেট করে ধানের দাম কমিয়ে দেয়। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে ধানের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে তাই সরকারকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।

দেশে প্রতিবছর ঝড়, বন্যা, শিলাবৃষ্টিসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। অনেক কিছুরই বীমা থাকলেও দেশে ফসলবীমা নেই। শত বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও আমাদের সোনার কৃষক ফসল ফলিয়েই যান। মাঝে মাঝে অবাক হই, সত্যিকারের দেশপ্রেম মনে হয় এটাকেই বলে। বারবার বঞ্চনার শিকার হয়েও দেশের প্রয়োজনে নিজের কাজ করে যাওয়া; তাঁদের ধানের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণে আমাদের কি কিছুই করার নেই?

লেখাঃ Vikash Roy
Assistant Professor, 
Dept. Of Fisheries Technology, HSTU

Facebook Comments