হ্যাচারিতে দেশী শিং-মাগুর মাছের কৃত্রিম প্রজনন

আবুল কালাম আজাদ:

মাছ চাষিরা পর্যাপ্ত পোনা না পাওয়ার কারণে দেশী শিং-মাগুর চাষে আগ্রহ হারাতে বসেছে অথচ পর্যাপ্ত পোনা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকলে মাছ দুটি চাষ করে চাষিরা অধিক লাভবান হতে পারতো। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশের মৎস্য বিজ্ঞানীরা দেশী শিং-মাগুরের কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও চাষ পদ্ধতির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন এবং এর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হ্যাচারিতে সীমিত আকারে সফলভাবে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে শিং-মাগুরের পোনা উৎপাদিত হচ্ছে।

ব্রুড শিং-মাগুর মাছ সংগ্রহ ও প্রজনন পূর্ববর্তী পরিচর্যা

ব্রুড মাছের মজুদ পুকুরটি শুকিয়ে শতাংশে ১ কেজি চুন, ১০ কেজি গোবর এবং পানি দেয়ার পর শতাংশে ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ২০০ গ্রাম টিএসপি, ২৫ গ্রাম এমপি প্রয়োগ করে প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি করতে হবে।পানির গভীরতা ১.২৫-১.৫ মিটার বা ৪-৫ ফুট রাখা প্রয়োজন।পুকুরের পানির উপযুক্ত তাপমাত্রা ও আলোর ব্যবস্থা থাকা দরকার।ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুস্থ, সবল ও পরিপক্ব ব্রুড মাছ সংগ্রহ করতে হবে।পুকুরের প্রতি শতাংশে ৪০-৬০টি থেকে ১০০-১৫০ টি ব্রুড শিং বা মাগুর মাছ রাখা যায়।পুরুষ ও স্ত্রী শিং বা মাগুর মাছ ১:১ অনুপাতে রাখতে হবে। শিং ও মাগুর উভয় প্রজাতির ব্রুডকে একই পুকুরে একত্রে না রাখাই উত্তম।মাছের মোট ওজনের ৫-৭% সম্পূরক খাবারের এক চতুর্থাংশ প্রতিদিন সকালে বাকী তিন ভাগ সন্ধ্যার পর পুকুরের চার কোণায় স্তূপাকারে ফিডিং ট্রেতে দিতে হবে।খাবারের সাথে অনুমোদিত এন্টিঅক্সিডেন্ট নির্ধারিত মাত্রায় এবং ভিটামিন-ই ২ গ্রাম/কেজি হিসাবে দিলে দ্রুত গোনাডের বৃদ্ধি ঘটে।কাঁচা গোবর মাসে ১০ দিন অর্থাৎ তিন দিন পর পর শতাংশে ১ থেকে ১.২৫ কেজি হারে প্রয়োগ করলে ডিম দ্রুত পরিপক্ব হয়। ১০০ কেজি গোবর ১০০ গ্রাম ব্লিচিং পাউডারের সাথে একত্রে মিশিয়ে ২৪ ঘণ্টা রাখলে গোবর ক্ষতিকারক জীবাণু মুক্ত হয়।ভাল ফলের জন্য মাছের ওজনের ৩% হারে টিউবিফেক্স প্রয়োগ করা উত্তম।মাছের শরীরে যেন চর্বি বেশি না জমে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।মাছকে বিরক্ত না করে শানি-তে থাকতে দেয়া উচিত।পুকুরে সীমিত পরিমাণে ভাসমান আগাছা (কলমিলতা বা হেলেঞ্চা) বেষ্টনী দিয়ে রাখা যেতে পারে।পুকুরের চারপাশ বানা বা জাল দ্বারা ঘেরাও করে নেয়া উত্তম।

শিং-মাগুরের কৃত্রিম প্রজনন

পুকুর খেকে পরিপক্ব স্ত্রী ও পুরুষ মাছ ১:১ হারে উঠিয়ে হ্যাচারিতে রেখে ৮-১০ ঘণ্টা খাপ খাওয়ানোর জন্য বিশ্রাম দিতে হয়। এ সময় পানির উচ্চতা ২-৩ ফুট রাখা হয় ও ঝর্ণার মাধ্যমে হালকা স্রোত সৃষ্টি করতে হয়।স্ত্রী মাছকে ১০০-১৩০ মিলিগ্রাম পিজি/কেজি হিসাবে একটি ইনজেকশন প্রয়োগ করা যায়। আবার স্ত্রী মাছকে প্রথম ইনজেকশন পিজি ৬০-৭০ মিলিগ্রাম/কেজি অথবা ওভাপ্রিম বা সুপ্রিম ২ মিলিগ্রাম/কেজি অথবা এইচসিজি ৫০০০ আইইউ (১০ মিলি দ্রবণ)/২.৫ কেজি অথবা প্রতি ভায়েল ওভুপিন এর ১০ মি.লি. দ্রবণ/ ৫কেজি মাছ হিসাবে এক ডোজে মাছের লেজের অংশে ৩০-৪৫ ডিগ্রি কোণে ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হয়।একই সাথে পুরুষ মাছকেও পিজি ২০-৩০ মিলিগ্রাম/কেজি অথবা ওভাপ্রিম বা সুপ্রিম ১ মিলিগ্রাম/কেজি অথবা এইচসিজি ৫০০০ আইইউ (১০ মিলি দ্রবণ)/৫ কেজি অথবা প্রতি ভায়েল ওভুপিন এর ১০ মি.লি. দ্রবণ/ ১০ কেজি মাছ হিসাবে একইভাবে ইনজেকশন প্রয়োগ করতে হয়।তবে আমার পরিচিত একজন এ বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞের অভিমত হল, স্ত্রী মাছকে প্রথম ইনজেকশন ৫০ মিলিগ্রাম পিজি/কেজি হিসাবে প্রয়োগ করে ৬-৮ ঘণ্টা পর ১০০ মিলিগ্রাম পিজি/কেজি হিসাবে দ্বিতীয় ইনজেকশন প্রয়োগ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। স্ত্রী মাছের দ্বিতীয় ইনজেকশনের সময় পুরুষ মাছকে ৫০ মিলিগ্রাম পিজি/কেজি হিসাবে প্রয়োগ করলে অধিক পরিমাণ মিল্ট পাওয়া যায়।ইনজেকশন প্রয়োগ সন্ধ্যায় করা ভাল। ইনজেকশন দেয়ার পর হালকা ঝর্ণায় মৃদু স্রোত সৃষ্টি করে স্ত্রী ও পুরুষ মাছ ১:১ অনুপাতে গোলাকার ট্যাংকে বা সিস্টার্নে রেখে দিতে হয়। এ সময় অন্ধকার পরিবেশ সৃষ্টি ও পানির উচ্চতা ২-৩ ফুট রাখতে হয়। মাছকে বিরক্ত না রে শান্তিতে থাকতে দিতে হয়।স্ত্রী মাছকে দ্বিতীয় ইনজেকশন দেওয়ার ৯-১২ ঘণ্টার মধ্যে মতান্তরে ১০-১৬ ঘণ্টার মধ্যে ডিম দিয়ে থাকে।স্ত্রী মাছের ডিম দেওয়ার সময় তাৎক্ষনিকভাবে পুরুষ মাছের পেট কেটে শুক্রাশয় বা টেস্টিস বের করে কাঁচি দিয়ে কুচি কুচি করে কেটে ০.২৫ লবণ দ্রবণে মতান্তরে ০.৮৫% লবণ দ্রবণে মিশিয়ে শুক্রাণুর দ্রবণ তৈরি করতে হবে।ডিম সংগ্রহ ও টেস্টিস দ্রবণ তৈরির কাজ দুটি একসাথে দ্রুততম সময়ে অর্থাৎ ৩-৪ মিনিটে করা ভাল, তবে তা সম্ভব না হলে আগে মাছের টেস্টিস কেটে দ্রবণ তৈরি করে নিয়ে পরে ডিম সংগ্রহ করতে হবে। অন্যথায় ডিম দ্রুত জমাট বেঁধে যাবে।স্ত্রী মাছে পেটে চাপ দিয়ে ডিম বের করে একটি শুকনা খালি পাত্রে সংগ্রহ করে তার উপর শুক্রাণু সংবলিত টেস্টিস দ্রবণ মিশিয়ে ঐ ডিম নিষিক্ত করা হয়।

ডিমের পরিচর্যা

শিং-মাগুর মাছের ডিম আঠালো হওয়ার কারণে ট্রে অথবা সিষ্টার্নে ৪-৬ ইঞ্চি পানির গভীরতায় ডিমগুলো ট্রে/সিষ্টার্নের তলদেশে ঘন মেস সাইজের মশারী কাপড়ের ফ্রেমে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং ঝর্ণা অথবা ০.৫ ইঞ্চি প্লাস্টিক পাইপ সূক্ষ্ম ছিদ্র করে ঝর্ণার ব্যবস্থা করতে হবে।লক্ষ্য রাখতে হবে ডিমগুলি যেন একস্থানে জড়ো না হয়। স্যালাইন প্রদানের পাইপ ব্যবহার করে ফু দিয়ে বা অক্সিজেন গ্যাস দিয়ে সাবধানে ডিমগুলি বারবার সরিয়ে ও ছড়িয়ে দিতে হয়। এ সময়, পানি পরিবর্তনের কাজটিও সাবধানে করতে হয়।ট্রে /শীর্ষস্থানে পানি নির্গমন মুখে গ্লাস নাইলন কাপড় দিয়ে দিতে হবে যাতে ডিম ফুটে রেণু বের হলে চলে যেতে না পারে।রেণু পোনা বের হলে ট্রে অথবা সিষ্টার্নের তলার ডিমের খোসা সহ অন্যান্য ময়লা সাইফোনিং করে পরিষ্কার করে দিতে হবে।ট্রে অথবা সিষ্টার্নের রেণু পোনা যাতে ফাঙ্গাসে আক্রান্ত না হয় সেজন্য মিথিলিন ব্লু বা ম্যালাকাইট গ্রিন অনুমোদিত মাত্রায় ব্যবহার করা যেতে পারে।১৮-২৪ ঘণ্টা, মতান্তরে ২২-২৮ ঘণ্টা পর নিষিক্ত ডিম ফুটে রেণু পোনা বের হয়। তবে এবিষয়ে অভিজ্ঞজনেরা এসময়কাল ২৮-৩২ ঘণ্টা বলে মনে করেন।

রেণু পোনার পরিচর্যা

ডিম থেকে রেণু বের হওয়ার ৪৮-৭২ ঘণ্টার মধ্যে আর্টিমিয়া বা সিদ্ধ হাঁসের ডিমের কুসুম রেণু পোনাকে খাওয়াতে হয়।প্রতি লক্ষ রেণুর জন্য দৈনিক ৪টি সিদ্ধ হাঁসের ডিমের কুসুম ৪ বারে প্রয়োগ করতে হয়। ১-২ দিন পর রেণু পোনা নার্সারি পুকুরে স্থানান্তর করা যায়।ডিম ফোটার ৩-৪ দিন পর রেণু পোনাকে ডিমের কুসুম, টিউবিফেক্স, জুপ্লাঙ্কটন বা আর্টিমিয়া খাবার হিসাবে দিতে হবে।ট্রে/সিষ্টার্নের কোনার দিকের কিছু অংশ কাল পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। কারণ রেণু পোনা অন্ধকার জায়গা পছন্দ করে এবং দিনের বেলায় অন্ধকার জায়গায় জড় হয়ে অবস্থান করে। রাত্রে সমস্ত ট্রে /শীর্ষস্থানে বিচরণ করে এবং রাত্রে খাবার খেতে বেশী পছন্দ করে।হ্যাচারিতে ৮/১০ দিন যত্ন সহকারে প্রতিপালনের পর ডিম পোনা থেকে ধানী পোনায় পরিণত হয়

আঁতুড় পুকুরে ধানী পোনার যত্ন

আগে থেকেই ধানী পোনা রাখার একটি আঁতুড় পুকুর তৈরি করে রাখতে হবে।৮-১০ দিনের ধানী শিং মাছের পোনা প্রতি শতাংশে ১০-১২ হাজার মজুদ করা যেতে পারে।৮-১০ দিনের ধানী মাগুর মাছের পোনার মজুদ ঘনত্ব প্রতি শতাংশে ৮-১০ হাজার হওয়া শ্রেয়।প্রতি দিন পোনার মোট ওজনের দ্বিগুণ ওজনের খাবার খাবার (যে কোন ভাল মানের ব্রান্ডের নার্সারি ফিড বা চিংড়ি নার্সারি ফিড) ২-৩ বারে দিতে হবে।ধানী পোনা ছাড়ার ৩০-৪০ দিনের মধ্যে ৫-৭ সেমি (২-৩ ইঞ্চি) লম্বা হয়ে চারা পোনায় পরিণত হয় যা মজুদ পুকুরে স্থানান্তরিত করার উপযুক্ত হয়ে থাকে।

তথ্যসূত্র:

ইনামুল হক, ২০০৬; বাংলাদেশের ছোট মাছ: জীববৈচিত্র্য, চাষ ব্যবস্থাপনা, পুষ্টিমান ও প্রক্রিয়াজাতকরণ; ময়মনসিংহ।কাজী ইকবাল আজম গং, ২০১২; দেশীয় শিং ও মাগুর মাছের প্রজনন ও রেণু উৎপাদন, জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০১২ সংকলন; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ; পৃষ্ঠা ১০৯-১১১।বিএফআরআই, ১৯৯৭; উন্নত জাতের হাইব্রিড মাগুর উৎপাদন প্রযুক্তি (লিফলেট); বাংলাদেশ মাৎস্য গবেষণা ইনষ্টিট্যুট, স্বাদু পানি কেন্দ্র, ময়মনসিংহ।বিএফআরআই, ১৯৯৯; উন্নত জাতের হাইব্রিড মাগুর চাষের কলাকৌশল (লিফলেট); বাংলাদেশ মাৎস্য গবেষণা ইনষ্টিট্যুট, স্বাদু পানি কেন্দ্র, ময়মনসিংহ।মৎস্য অধিদপ্তর, ২০০২; দেশী মাগুর ও শিং মাছ এর চাষ, মাছ চাষ ম্যানুয়াল; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ।মৎস্য অধিদপ্তর, ২০০৫; মাছের কৌলিতাত্ত্বিক উন্নয়ন ও ব্রুড স্টক ব্যবস্থাপনা (প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল); মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ।মৎস্য অধিদপ্তর, ২০০৯; কৈ, শিং ও মাগুর মাছচাষ ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ মডিউল; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ।মৎস্য অধিদপ্তর, ২০১১; পুকুরে শিং ও মাগুর মাছ চাষ, বার্ষিক মৎস্য সংকলন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়; পৃষ্ঠা ১২০-১২৫।মোঃ জাহাঙ্গীর আলম গং, ২০১০; বাণিজ্যিকভিত্তিতে পুকুরে শিং মাছের চাষ, জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০১০ সংকলন; মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ; পৃষ্ঠা ৩২।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.